বিশ্ব বাণিজ্যে ২০২৬ সালেও থাকবে ট্রাম্পের শুল্কনীতির অনিশ্চয়তা?

২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি।

২০২৫ সালে বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতের সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতি। প্রায় সারা বছরই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কবিবাদ। মার্কিন আমদানি করকে ১৯৩০-এর দশকের মহামন্দার পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে তুলে নিয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রবর্তিত রেসিপ্রোক্যাল ট্যারিফ। সামগ্রিকভাবে আর্থিক বাজারেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে ট্রাম্পের শুল্কনীতির ঢেউ। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি নিয়ে নতুন ধরনের আলোচনার সূচনা হয়েছে ২০২৫ সালে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালেও ট্রাম্পের শুল্কনীতি সৃষ্ট বেশকিছু অনিশ্চয়তা বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রভাবক হিসেবে বিরাজ করবে। খবর রয়টার্স।

মার্কিন শিল্পোৎপাদন খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্দেশ্যে এ শুল্কনীতি চালু করা হয়েছে বলে দাবি করছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইয়েল বাজেট ল্যাবের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গড় আমদানি শুল্কহার প্রায় ৩ থেকে প্রায় ১৭ শতাংশ উন্নীত হয়েছে। এ বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত আদায় করছে যুক্তরাষ্ট্র।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি করতে বিশ্বনেতাদের প্রায় বাধ্য করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কম শুল্কের শর্তে যুক্তরাষ্ট্রে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে অনেক দেশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), যুক্তরাজ্য, সুইজারল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভিয়েতনামসহ যুক্তরাষ্ট্রের বড় অংশীদাররা নতুন বাণিজ্য কাঠামো চুক্তি করেছে। যদিও চীনের সঙ্গে চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি এখনো অসম্পূর্ণই রয়ে গেছে।

১৫ শতাংশ শুল্কহারের চুক্তি এবং বড় বিনিয়োগের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির কারণে সদস্য দেশগুলোর কাছে ব্যাপক সমালোচিত হয়েছে ইইউ। ফ্রান্সের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফ্রাসোঁয়া বাইরু চুক্তিকে ‘নতজানুমূলক’ এবং ইউরোপীয় ব্লকের জন্য ‘অন্ধকার দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বিদায়ী ২০২৫ সালে ইউরোপীয় অর্থনীতিগুলো নতুন শুল্কহারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছে বিভিন্ন ধরনের ছাড় ও বিকল্প বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের মাধ্যমে। ফরাসি ব্যাংক সোসিয়েতে জেনারেলের এক প্রাক্কলন অনুযায়ী, ইইউর ওপরে মার্কিন শুল্কের প্রভাব অঞ্চলটির মোট জিডিপির দশমিক ৩৭ শতাংশের সমতুল্য।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি সত্ত্বেও বিদায়ী বছরে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে। কারণ হিসেবে বড় আকারে বিকল্প বাজার সম্প্রসারণকে চিহ্নিত করেছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, উৎপাদন খাতের শৃঙ্খলা এবং দুষ্প্রাপ্য খনিজ সম্পদের মালিকানাকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের চাপকে একযোগে মোকাবেলা করেছে বেইজিং।

অনেক অর্থনীতিবিদের আশঙ্কা ছিল, বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণ হতে পারে ট্রাম্পের শুল্কনীতি। তবে শেষ পর্যন্ত তা ঘটেনি। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) সামান্য সংকুচিত হয়েছিল মার্কিন অর্থনীতি। কারণ শুল্ক কার্যকর হওয়ার আগে দেশটিতে পণ্য আমদানির তৎপরতা বেড়ে যায়। তবে সংকোচন থেকে দ্রুত পুনরুদ্ধার ঘটে মার্কিন অর্থনীতির। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিনিয়োগের উচ্চগতি ও স্থিতিশীল ভোক্তাব্যয় দেশটিতে প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রেখেছে। ট্রাম্পের লিবারেশন ডে ট্যারিফ ঘোষণার পর আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দুই দফা বৈশ্বিক জিডিপির পূর্বাভাস ঊর্ধ্বমুখী সংশোধন করেছে। কারণ আগে পূর্বাভাসকৃত অনিশ্চয়তা কমে এসেছে।

মূল্যস্ফীতি কিছুটা বেশি থাকলেও এখন কিছু অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক ধারণা করছেন, মার্কিন শুল্কের প্রভাব আগে যেমনটা ভাবা হয়েছিল, ততটা বড় বা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। কারণ আমদানি শুল্কের বাড়তি খরচ পুরোটা ভোক্তার ঘাড়ে পড়ছে না। সরবরাহ চেইনের বিভিন্ন ধাপে উৎপাদক, আমদানিকারক, খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তারা এ ব্যয় ভাগ করে নিচ্ছে।

তবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ট্রাম্প আরোপিত উচ্চ শুল্ক বহাল থাকবে কিনা সে বিষয়টিকেই ২০২৬ সালের জন্য বৈশ্বিক বাণিজ্য খাতের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন বাজার বিশ্লেষকরা। এরই মধ্যে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফের আইনি কাঠামো মার্কিন আদালতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতে এ বিষয়ে আদালতের রায় আসতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্টে হেরে গেলে শুল্ক বহাল রাখতে মরিয়া চেষ্টা করবে ট্রাম্প প্রশাসন। সেক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী আইনি ক্ষমতা অর্জনের দিকে যেতে পারে হোয়াইট হাউজ। তবে এসব বিকল্প বেশ জটিল এবং এগুলোর সীমাবদ্ধতা অনেক। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আপাতত এটুকু স্পষ্ট যে উচ্চ আদালতে হার স্বীকার করবেন না ডোনাল্ড ট্রাম্প।

চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিই আসন্ন বছরে ইউরোপে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। অনেক বছর ধরে ইউরোপীয় রফতানির নির্ভরযোগ্য গন্তব্য চীন। ইউয়ানের অবমূল্যায়ন ও উৎপাদন খাতে মূল্য সংযোজনে উন্নয়নের কারণে চীনের রফতানিকারকরাও সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক শ্লথতার কারণে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোও এখন অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণে হিমশিম খাচ্ছে। এক্ষেত্রে ইউরোপজুড়ে প্রশ্ন উঠছে, অঞ্চলটি চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক অসামঞ্জস্য দূর করতে শুল্ক বা অন্য কোনো ব্যবস্থার দ্বারস্থ হবে কিনা।

এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র-চীনের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি এখন অনেক গুরুত্ববহ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। দুই বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি পর্যালোচনা করা হবে আগামী বছর। এখানেও অনিশ্চয়তা রয়েছে।

কোর ইনভেস্টমেন্টসের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা এবং এএক্সএ ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজার্সের ইনভেস্টমেন্ট ইনস্টিটিউটের চেয়ার ক্রিস ইগো বলেন, ‘মনে হচ্ছে মূল্যস্ফীতি কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন শুল্কনীতির কঠোরতা কিছুটা কমিয়েছে।’

আগামী বছরের জন্য দেয়া পূর্বাভাসে ক্রিস ইগো বলেন, ‘এখন বাজারে উদ্বেগ আগের চেয়ে কম। কারণ মার্কিন সরকার শুল্ক নিয়ে খুব কড়া অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসছে। যদি শুল্ক কমে বা অন্তত বাড়ানো না হয়, তাহলে পণ্যের দাম বাড়ার চাপও কিছুটা কম হতে পারে।’

ক্রিস ইগো বলেন, ‘২০২৬ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই এমন সময় চীনের সঙ্গে বিবাদ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে না। বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাণিজ্য চুক্তিই ভালো সমাধান।’

আরও